নিউমুরিং টার্মিনাল ইজারাঃ
নৌ উপদেষ্টা বললেন চুক্তি ঠেকানো সম্ভব নয়
৬ দিন পর চট্টগ্রাম বন্দরে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য
এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ
★ শনিবারের মধ্যে দাবী বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত না আসলে রবিবার থেকে পুনরায় কার্যক্রম বন্ধ ঘোষনা।
★ বন্দরের ১৫ জন কর্মচারীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর চিঠি দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারার চুক্তি ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে চুক্তি কোন পর্যায়ে হবে, সে বিষয়ে তিনি তাঁর বক্তব্য দিয়ে এসেছেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, কোনো চুক্তিতেই কিছু চাপিয়ে দেওয়া হবে না।
টানা ৬ দিন অচল থাকার পর দেশের প্রধান চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে আবারও কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে বন্দরে পূর্ণাঙ্গ অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু হয়। শ্রমিক-কর্মচারীরা জানান, কন্টেইনার হ্যান্ডলিং, কন্টেইনার ডেলিভারি এবং জাহাজে পণ্য ওঠানামা স্বাভাবিক হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে বন্দর ভবনের সামনে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন নৌ উপদেষ্টা। শ্রমিকদের কর্মবিরতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, শ্রমিকদের দাবিগুলো বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এরপরও যদি তারা কাজে না ফেরেন এবং যারা কাজ করতে চান তাদের বাধা দেন, তাহলে সরকার কঠোর অবস্থানে যাবে।
রমজান মাস সামনে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বন্দরে রমজানের প্রয়োজনীয় অনেক পণ্য রয়েছে। এই সময়ে বন্দর বন্ধ রেখে আন্দোলন করা গ্রহণযোগ্য নয়। এটি মানুষকে কষ্ট দেওয়ার শামিল। এ কষ্টের দায়ভার কে নেবে— এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
শ্রমিক আন্দোলনের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, শ্রমিক নেতাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে। এরপরও যদি তারা আশ্বস্ত না হন, তবে অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
এনসিটি ইজারার বিষয়টি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আদালত যদি এই চুক্তি না করার নির্দেশ দেয়, তবে সরকারের সে আদেশ মানা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।
চুক্তি প্রক্রিয়ায় তাড়াহুড়ো বা অস্বচ্ছতা নেই দাবি করে তিনি বলেন, গত ছয় মাস ধরে ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রতিনিধিরা বন্দরে আসছেন এবং গত তিন মাস ধরে আলোচনা চলছে। এখানে তাড়াহুড়োর কিছু নেই।
দেশের স্বার্থ বিরোধী কোনো চুক্তি করা হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, যতদিন তিনি দায়িত্বে আছেন, দেশের ক্ষতি হয়— এমন কোনো চুক্তি হতে দেবেন না।
এদিকে সকালে নৌ উপদেষ্টা বন্দর ভবনে পৌঁছালে উত্তেজিত শ্রমিকরা তার গাড়িবহর আটকে দেন। প্রায় ২০ মিনিট গাড়িবহর আটকে থাকে। পরে ব্যবসায়ী নেতা ও বন্দর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি শ্রমিকদের প্রতিনিধিদের আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। তবে প্রথম দফায় শ্রমিকরা বন্দর ভবনের বাইরে আলোচনায় বসতে রাজি হননি। পরবর্তীতে দুপুর আড়াইটার দিকে তিনি পুনরায় বন্দর ভবনে ফিরে শ্রমিকদের ১৪ সদস্যের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন উপদেষ্টা।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ দুই দিনের জন্য কর্মবিরতি স্থগিত করেছে। পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর জানান, রমজান মাস ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শুক্রবার ও শনিবার কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছে। শনিবারের মধ্যে দাবি বিষয়ে সিদ্ধান্ত না এলে রোববার থেকে আবার কর্মবিরতি কর্মসূচি শুরু হবে।
সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন বলেন, তাদের দাবি রয়েছে,- নিউমুরিং টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া যাবে না, শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রত্যাহার করতে হবে এবং বন্দর চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানের পদত্যাগ নিশ্চিত করতে হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক জানান, শুক্রবার সকাল থেকে বন্দরের সব কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়েছে।
গত ৩১ জানুয়ারি থেকে নিউমুরিং টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিকরা আন্দোলন শুরু করেন। পরে তা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে রূপ নেয়। এতে বন্দরের জেটিতে থাকা অন্তত ১০টি জাহাজে পণ্য আটকে পড়ে এবং প্রায় ১৩ হাজার রপ্তানি কন্টেইনার বিভিন্ন ডিপোতে জমে যায়।
কর্মবিরতি সাময়িক স্থগিতের পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে সীমিত আকারে কাজ শুরু হয় এবং শুক্রবার সকাল থেকে পুরোপুরি সচল হয় বন্দর কার্যক্রম।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর অচল করে আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগে বন্দরের ১৫ জন কর্মচারীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর চিঠি দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি এই কর্মচারীদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তদন্তের জন্যও চিঠিতে বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিমের সই করা চিঠিতে এ অনুরোধ করা হয়। চিঠির তথ্য নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম বন্দরের চিফ পারসোনেল অফিসার নাসির উদ্দিন।
বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিমের সই করা চিঠিতে ওই ১৫ কর্মচারীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও সম্পদ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থাকে (এনএসআই) অবহিত করা হয়েছে। দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার অনুরোধ জানানো তালিকায় রয়েছেন- মোংলা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগের অডিট সহকারী মো. হুমায়ুন কবির এবং পায়রা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া নৌ বিভাগের ইঞ্জিন ড্রাইভার মো. ইব্রাহিম খোকন, পায়রা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া প্রকৌশল বিভাগের এসএস খালাসি মো. ফরিদুর রহমান, পরিবহন বিভাগের উচ্চ বহিঃসহকারী মো. শফি উদ্দিন, রাশেদুল ইসলাম, পরিকল্পনা বিভাগের স্টেনোটাইপিস্ট মো. জহিরুল ইসলাম, বিদ্যুৎ বিভাগের এসএস পেইন্টার মো. হুমায়ুন কবির, যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার মো. লিয়াকত আলী এবং যান্ত্রিক বিভাগের খালাসি মো. রাব্বানী। তালিকায় আরো আছেন- মোংলা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া পরিবহন বিভাগের এফসিএল শাখার উচ্চ বহিঃসহকারী আব্দুল্লাহ আল মামুন, প্রশাসন বিভাগের উচ্চমান সহকারী মো. শাকিল রায়হান, যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার মানিক মিঝি, প্রকৌশল বিভাগের মেসন মো. শামশু মিয়া এবং যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার আমিনুর রসুল বুলবুল।