পাইপলাইনে ছিদ্র থেকে তেল লিক — জৈতাছড়ায় আগুনে একই পরিবারের তিনজন দগ্ধ; দুইজনের মৃত্যু, একজন লাইফ সাপোর্টে
মনজু বিজয় চৌধুরী, মৌলভীবাজার।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুনবীর ইউনিয়নের পশ্চিম ইলামপাড়ায় শেভরন বাংলাদেশের কনডেনসেট তেলবাহী পাইপলাইনে দুর্বৃত্তদের ছিদ্র করার পর তেল লিক হয়ে জৈতাছড়া গাংয়ে আগুন ধরে বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাত ৯টার দিকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ওই দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিনজন গুরুতর দগ্ধ হন — বশির মিয়া (৫০), তার স্ত্রী পারভিন বেগম (৪০) ও ছেলে রেদওয়ান (২২)। ঢাকায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার ভোরে বাবা বশির মিয়া ও ছেলে রেদওয়ান মারা যান; পারভিন বেগম লাইফ সাপোর্টে রয়েছেন।
শুরুতে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হলে পরে তাঁদের মৌলভীবাজার সদর, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ এবং সর্বশেষ ঢাকা মেডিকেলে স্থানান্তর করা হয়। ঢাকা মেডিকেলের বার্ণ ইউনিটে পরলোকগমন করেন বশির মিয়া ও রেদওয়ান; পারভিন বেগম বর্তমানে শ্বাসনালী-সহায়ক মেশিনে লাইফ সাপোর্টে আছেন। হাসপাতালে থাকা আত্মীয় মোছাদ্দিকুর রহমান মুঠোফোনে জানান, ভোর সাড়ে চারটার দিকে রেদওয়ান মারা যান; সকাল ৬:২০ মিনিটে বশির মিয়া মারা যান।
পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে উপজেলা প্রশাসন ২০ হাজার টাকার অনুদান দিয়েছে এবং শেভরন ও পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে চিকিৎসা ব্যয়ভার নেওয়ার প্রতিশ্রুতি এসেছে, তবে এ পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা সরাসরি পাননি; ফলে পরিবারের লোকজন চিকিৎসা ব্যয় জোগাতে ধার-ঋণে বিপর্যস্ত। নিহত বশির মিয়ার ভাতিজা ইয়াকুব বলেছেন, “শেভরনের কারণে পরিবারের দুই জন মরে গেছে — আমরা বিচার চাই।”
ঘটনাস্থলে শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজার ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট প্রায় এক ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ফায়ার সার্ভিস সূত্রে বলা হয়েছে, আগুন যদি সরাসরি পাইপলাইনের ছিদ্রস্থলের সঙ্গে পৌঁছিয়ে যেত, তা বড় ধরনের বিস্ফোরণে রূপ নিতে পারত। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন, একদিন আগে থেকেই পাইপলাইনে ছিদ্র করে তেল লিক হচ্ছিল—তার পরও শেভরনের তৎপর নজরদারির নমুনা ছিল না।
পরিবারে পোস্ট মর্টেম নিয়ে দ্বিধা-বিবাদও দেখা দিয়েছে। নিহত বশির মিয়ার ভাতিজি নাসিমা বেগম জানিয়েছেন তারা পোস্ট মর্টেম করাতে চান না—তবে শ্যালক ছাদিকুর রহমান পরে বলেছেন তিনি দুটি লাশ পোষ্ট মর্টেম করিয়ে ন্যায়বিচার চান এবং আইনের মাধ্যমে বিচার চাইবেন। ঢাকায় মারাত্মক আঘাতে মৃতদেহগুলো বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা রয়েছে; পোস্ট মর্টেম চলছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. ইসলাম উদ্দিন জানান, নিহতদের বিষয়টি তিনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন এবং শোভ-সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শিশুলগ্নভাবে শেভরন বাংলাদেশকে সাথে কথা বলা হয়েছে—শেভরন মানবিক সহায়তা করবে বলে জানিয়েছে, তবে নির্দিষ্ট কী ধরণের সহযোগিতা হবে তা চূড়ান্ত হয়নি। ইউএনও আরও জানান, স্মাইল নামক একটি এনজিও নিহতদের লাশ বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করবে।
শেভরন কোম্পানির মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনস ম্যানেজার শেখ জাহিদুর রহমান বলেন, “নিহতের খবর আমরা পেয়েছি; বিষয়টি দেখছি এবং ইউএনওর সাথে কথা বলছি যাতে তাদের সহায়তা করা যায়।” তিনি স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টি দেখার কথা জানান।
স্থানীয়দের অভিযোগ করে বলেন সমূহ:
পূর্বেই পাইপলাইনে ছিদ্র করে তেল লিক হচ্ছিল বলে স্থানীয়রা জানায়; তৎক্ষণাৎ সতর্কবার্তা বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
থানাবাসী ও সামাজিক সংগঠনগুলো শেভরন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তুলেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার অনুরোধ করা হয়েছে।
জনবসতির পাশ দিয়ে যেসব তেল/গ্যাস পাইপলাইন গেছে সেগুলোর নিরাপত্তা পুনর্মূল্যায়ন ও ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি রোধে জনসচেতনতা জরুরি, বলে এলাকাবাসী দাবি করেছেন।
ঘটনাটি স্থানীয় সীমা পেরিয়ে জাতীয় স্তরে আলোচিত হতে শুরু করেছে এবং প্রশ্ন উঠেছে—“বাংলাদেশ কি বহুজাতিক কোম্পানির হাতে শুধু সম্পদ দেবে, আর দায়িত্বহীনতায় মানুষের প্রাণ গেলে চুপ থাকবে?”—এমন প্রশ্ন করে প্রতিবাদমূলক মনোভাব প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী ও স্থানীয় সংগঠনগুলো।
অবস্থা সংবেদনশীল থাকায় নিহতদের লাশ হস্তান্তর ও পোস্ট মর্টেম-সংক্রান্ত কৌতুকপূর্ণ দ্বন্দ্ব সমাধানে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন। পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার ব্যাপারে শেভরন ও সরকারি কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত বিবৃতি এবং তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে পরবর্তী ব্যবস্থা এবং আইনি কার্যক্রম সম্পর্কিত তথ্য জানানো হবে।
মনজু বিজয় চৌধুরী
মৌলভীবাজার