মো: রুবেল মিয়া | জেলা প্রতিনিধি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলায় যৌতুকের দাবিতে দীর্ঘদিনের শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক অপমান সহ্য করতে না পেরে কবিতা আক্তার (২৫) নামে এক গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নিহতের মা শাহানা আক্তার বাদী হয়ে বিজয়নগর থানায় ৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন।
ঘটনাটি ঘটে গত ৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ বিকেলে বিজয়নগর থানার মহেষপুর গ্রামে। নিহত কবিতা আক্তার
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার মনিপুর গ্রামের বাছির মিয়ার মেয়ে।
এজাহার ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়
২০১৯ সালে মহেষপুর গ্রামের হাকিম শাহ (৩০)–এর সঙ্গে পারিবারিকভাবে কবিতার বিয়ে হয়। বিয়ের সময় কবিতার পরিবার থেকে ৩ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার ও আসবাবপত্রসহ ২ লাখ টাকা যৌতুক দেওয়া হয়। দাম্পত্য জীবনে তাদের একটি চার বছর বয়সী পুত্রসন্তান রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিয়ের পর থেকেই কবিতাকে আরও যৌতুকের জন্য চাপ দিতে থাকে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন। কয়েক বছর আগে স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে কবিতা বাবার বাড়িতে চলে যান। পরবর্তীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের ‘উইমেন্স সাপোর্ট সেন্টার’-এ অভিযোগ করা হলে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে শ্বশুরবাড়ির লোকজন আর নির্যাতন করবে না মর্মে মুচলেকা দিয়ে কবিতাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেয়।
বিদেশ যাওয়ার টাকা ও নতুন করে নির্যাতন
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, কিছুদিন যেতে না যেতেই স্বামী হাকিম শাহ বিদেশ যাওয়ার কথা বলে ২ লাখ টাকা দাবি করেন। মেয়ের সংসার টিকিয়ে রাখার আশায় দরিদ্র বাবা কষ্ট করে ১ লাখ টাকা দেন। এরপর কবিতাকে কিছু না জানিয়ে গোপনে বিদেশে চলে যান হাকিম শাহ।
স্বামী বিদেশে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। প্রবাস থেকে ফোনে নির্দেশ দিয়ে এবং দেশে থাকা পরিবারের সদস্যরা (২ থেকে ৭ নম্বর আসামি) ঘর নির্মাণের অজুহাতে আরও ২ লাখ টাকা আনার জন্য চাপ দিতে থাকে।
‘বিষ খেয়ে মরতে’ প্ররোচনার অভিযোগ
টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গত ৫ জানুয়ারি বিকেলে কবিতাকে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। নিহতের মা শাহানা আক্তার অভিযোগে বলেন,
“একপর্যায়ে আমার মেয়েকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে বলা হয়— ‘২ লাখ টাকা না দিতে পারলে গলায় দড়ি দে বা বিষ খেয়ে মর।’”
এই অপমান ও নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে কবিতা ঘরে থাকা কীটনাশক (কেরির বড়ি) খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। মুমূর্ষু অবস্থায় শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর আসামিরা হাসপাতালে লাশ রেখে পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ।
তদন্ত ও পুলিশের বক্তব্য
পুলিশ নিহতের লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেছে। এ ঘটনায় স্বামী হাকিম শাহ, শ্বশুর কাহার শাহ, শাশুড়ি সাজেদা বেগমসহ ৭ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
বিজয়নগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বলেন,
“এ ঘটনায় একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রতিবেশীদের দাবি
ঘটনার দিন ও পরদিন নিহতের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় প্রতিবেশীরা জানান, তারা শুনেছেন কবিতা কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তবে তারা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন
, পাশাপাশি নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সে
বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন।
এদিকে, নিহতের প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত শেষে খুব শিগগিরই ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে।