June 5, 2026, 1:20 am
শিরোনাম :
চট্টগ্রামের বর্জ্য থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে আগ্রহী চীনা কনসোর্টিয়াম নওগাঁর পোরশায় মাদকবিরোধী অভিযানে দুই মাদক ব্যবসায়ী আটক নিরাপদ নয় শৈশব?”— হাতীবান্ধায় বৃদ্ধ ভ্যানচালকের লোলুপ দৃষ্টির শিকার শিশু পতেঙ্গায় ৫ লাখ টাকার চোরাই কয়লা জব্দ ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের মানুষের সেবায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক ফখরুল ইসলাম বিএসএফের গুলির অভিযোগ, তদন্তে পুলিশ চট্টগ্রাম বন্দরের জট কমাতে আরও ১০২ কন্টেইনার পণ্য নিলামে ৬ দফা দাবিতে চমেক ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের মানুষের সেবায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক ফখরুল ইসলাম অকটেন, কেরোসিন ও পেট্রোলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ করেছে বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি

অশ্রুতে ভেজা বিদায় : এক আলোকবর্তিকার প্রস্থান, কাঁদলো পুরো বিদ্যালয়

Reporter Name

অশ্রুতে ভেজা বিদায় : এক আলোকবর্তিকার প্রস্থান, কাঁদলো পুরো বিদ্যালয়

গাইবান্ধা থেকে মোঃ আবু জাফর মন্ডলঃ

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা-এর পবনাপুর ইউনিয়ন-এর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফকির হাট দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় আজ যেন এক শোকাহত জনপদে পরিণত হয়েছিল। বিদ্যালয়ের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল কান্না আর দীর্ঘশ্বাসে। কারণ, বিদায় নিচ্ছিলেন এমন একজন শিক্ষক, যিনি শুধু একজন শিক্ষকই ছিলেন না— ছিলেন হাজারো শিক্ষার্থীর জীবনের আলোকবর্তিকা, ছিলেন স্বপ্ন দেখানোর কারিগর, ছিলেন জ্ঞানের এক জীবন্ত বাতিঘর।
বিদ্যালয়ের সহকারী সিনিয়র শিক্ষক, রসায়ন ও গণিত বিষয়ের সেই কিংবদন্তিতুল্য মেধাবী মানুষটির বিদায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল অগণিত ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক ও এলাকাবাসী। কিন্তু সেখানে কোনো উৎসবের আনন্দ ছিল না; ছিল শুধুই বুকভাঙা কান্না, নিঃশব্দ বেদনা আর হারিয়ে ফেলার ভয়।
সকালের সূর্য উঠলেও যেন বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে কোনো আলো ছিল না। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, প্রতিটি বেঞ্চ, প্রতিটি দেয়াল যেন আজ নিঃশব্দে কাঁদছিল। যে মানুষটি বছরের পর বছর ধরে এই বিদ্যালয়ের প্রতিটি ইট-পাথরের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন, আজ তাঁকে বিদায় জানাতে গিয়ে সবাই যেন নিজেদের একজন অভিভাবককে হারানোর শোক অনুভব করছিলেন।
এই গুণী শিক্ষক জন্মগ্রহণ করেছিলেন মনোহরপুর ইউনিয়ন-এর ১নং কুমারগাড়ী হালিম নগর গ্রামের পশ্চিমপাড়ার এক সাদামাটা মধ্যবিত্ত খন্দকার পরিবারে। অভাব-অনটনের মাঝেও তিনি কখনো হার মানেননি। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি প্রথম স্থান অর্জন করে প্রমাণ করেছিলেন— মেধা আর পরিশ্রমের কাছে কোনো বাধাই বড় নয়।
তিনি ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি নিজের মেধাকে শুধু নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। শিক্ষকতা জীবনে রসায়ন ও গণিতের মতো কঠিন বিষয়কে তিনি এমন সহজভাবে উপস্থাপন করতেন যে দুর্বল শিক্ষার্থীরাও তাঁর হাতে হয়ে উঠতো আত্মবিশ্বাসী। তাঁর ক্লাস মানেই ছিল মুগ্ধতা, অনুপ্রেরণা আর নতুন স্বপ্ন দেখার প্রেরণা।
আজ তাঁর বিদায়ের দিনে শিক্ষার্থীদের চোখের জল যেন থামতেই চাইছিল না। কেউ স্যারের হাত ধরে কাঁদছিল, কেউ পায়ের কাছে বসে অশ্রু ঝরাচ্ছিল, আবার কেউ দূরে দাঁড়িয়ে নির্বাক চোখে তাকিয়ে ছিল প্রিয় মানুষটির দিকে। বিদ্যালয়ের ছোট ছোট শিক্ষার্থীরাও বুঝে গিয়েছিল— আজ তারা একজন অসাধারণ মানুষকে হারাতে চলেছে।
বিদায় অনুষ্ঠানে এক শিক্ষার্থী কান্নাভেজা কণ্ঠে বলে ওঠে—
“স্যার আমাদের শুধু বই পড়াননি, তিনি আমাদের বাঁচতে শিখিয়েছেন। ভুল করলে বাবার মতো শাসন করেছেন, আবার বিপদে ছায়ার মতো পাশে থেকেছেন। আজ মনে হচ্ছে আমাদের মাথার ওপরের ছায়াটাই সরে যাচ্ছে…”
এই কথা শুনে উপস্থিত অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।
সহকর্মীরা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার আবেগে ভেঙে পড়েন। তারা বলেন—
“তিনি ছিলেন বিদ্যালয়ের প্রাণ। তাঁর সততা, নিষ্ঠা, বিনয় ও অসাধারণ মেধা আমাদের চিরকাল পথ দেখাবে। তাঁর মতো শিক্ষক পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার।”
অভিভাবকরাও বলেন,
“আমাদের সন্তানদের মানুষ করার পেছনে এই শিক্ষকের অবদান কখনো ভোলার নয়। তিনি শুধু শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন একজন প্রকৃত অভিভাবক।”
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে পুরো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীরা ফুল হাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে প্রিয় শিক্ষককে শেষ সম্মান জানায়। কেউ গোলাপ দিচ্ছিল, কেউ জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল। চারদিকে শুধু একটি শব্দই বারবার শোনা যাচ্ছিল—
“স্যার, আমাদের ভুলে যাবেন না…”
বিদায়ের শেষ মুহূর্তে প্রিয় শিক্ষকও আর নিজের অশ্রু ধরে রাখতে পারেননি। কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেন—
“আমি হয়তো আজ বিদ্যালয় থেকে বিদায় নিচ্ছি, কিন্তু তোমাদের ভালোবাসা, তোমাদের মুখ আর এই বিদ্যালয়ের প্রতিটি স্মৃতি আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভুলতে পারব না। তোমরাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন…”
এই কথার পর পুরো পরিবেশ যেন আরও ভারী হয়ে ওঠে। অঝোরে কাঁদতে থাকে শিক্ষার্থীরা। অনেকেই বলছিল—
“এমন শিক্ষক হয়তো আর কোনোদিন আসবে না…”
আজকের এই বিদায় শুধু একজন শিক্ষকের বিদায় নয়; এটি যেন একটি যুগের অবসান। একজন আদর্শবান, মেধাবী ও মানবিক শিক্ষকের প্রস্থান, যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে।
তবে মানুষ চলে গেলেও তাঁর আদর্শ কখনো হারিয়ে যায় না। ফকির হাট দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়-এর প্রতিটি দেয়ালে, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে, প্রতিটি শিক্ষার্থীর হৃদয়ে তিনি আজীবন বেঁচে থাকবেন— ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর অশ্রুসিক্ত স্মৃতির অনন্ত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা