হাম আক্রান্ত শিশুদের সুচিকিৎসায় দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বিক্ষোভ মিছিল ও স্মারকলিপি পেশ-
মোঃ কুতুব উদ্দিন
ঢাকা
আজ ১৩ মে, বুধবার সকাল ১১ টায় সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমাবেশ থেকে হামে আক্রান্ত শিশুদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত, হামের টিকা কেনার অব্যবস্থাপনায় জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা এবং ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের বাজেটে শিক্ষাখাতে জিডিপির ৬ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যখাতে ৫ শতাংশ বরাদ্দের দাবি জানানো হয়েছে। সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক প্রগতি বর্মণ তমার সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক, অর্থ সম্পাদক নওশিন মুসতারি সাথী এবং সাধারণ সম্পাদক রাফিকুজ্জামান ফরিদ। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় সভাপতি সালমান সিদ্দিকী। সমাবেশ শেষে বিভিন্ন দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ডসহ একটি মিছিল ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থান প্রদক্ষিণ করে টিএসসিতে গিয়ে শেষ হয়। সমাবেশ ও মিছিল শেষে একটি প্রতিনিধি টিম অর্থমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পেশ করেছে।
সমাবেশে মোজাম্মেল হক বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেলেও এর প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের ঘাটতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা স্বাস্থ্য ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। গণমাধ্যমের তথ্য অনুসারে, মৃত্যুর সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে। প্রতিদিন আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের টিকা কেনায় অবহেলা ও অব্যবস্থাপনা, টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশুমৃত্যু ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে বর্তমান সরকারের যথাযথ পদক্ষেপের ঘাটতিও লক্ষণীয়। অবিলম্বে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের টিকা কেনায় অবহেলা ও অব্যবস্থাপনায় জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।”
নওশিন মুশতারি সাথী বলেন, “বাংলাদেশে শিক্ষা খাত বরাবরই অবহেলিত ও উপেক্ষিত থেকেছে। শিক্ষায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার প্রতিটি স্তর নানারকম সংকট মোকাবেলা করছে। শিক্ষার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। শিক্ষা খাতে বেসরকারিকরণ-বাণিজ্যিকীকরণ এবং সংকোচন নীতি কার্যকর হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার ব্যয়ভার বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং গরিব-নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরা শিক্ষার অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছে। বর্তমান সরকার অভ্যুত্থান পরবর্তী এক বিশেষ সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অংশ হিসেবে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তনে সরকার প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখবে– এটি ছাত্র সমাজ প্রত্যাশা করে। এছাড়া শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা বিএনপি সরকারের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, বর্তমান সরকার বিগত সরকারগুলোর মতো শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অবহেলার চোখে দেখবে না।”
সমাবেশে রাফিকুজ্জামান ফরিদ বলেন, “অন্তরবর্তীকালীন সরকার এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে আমেরিকার সাথে বাণিজ্য চুক্তি করেছে, বন্দর ইজারা দিয়েছে, করিডোর দিয়েছে। অথচ টিকাদান কর্মসূচির মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অবহেলা করেছে, যার ফলে অসংখ্য তাজা প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। এখন বিএনপি সরকার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দিচ্ছে। এই স্লোগানকে সত্যিকার অর্থে ধারণ করতে হলে সবার আগে দেশের হামে আক্রান্ত শিশুদের সুচিকিৎসার পদক্ষেপ নিতে হতো- প্রত্যেক সরকারি হাসপাতালে ‘হাম কর্নার’ চালু, আইসিইউ-র ব্যবস্থা করতে হতো। কিন্তু সরকারের সেই ত্বরিত পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।”
সভাপতির বক্তব্যে সালমান সিদ্দিকী বলেন, “ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষা সংস্থাগুলোর সুপারিশ অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশে বাজেটের অন্তত ২৫ শতাংশ বা জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা উচিত । এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকালেও দেখা যায়, ভিয়েতনাম তার বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশ, মালয়েশিয়া ১৯ শতাংশের উপরে এবং এমনকি নেপালও বাংলাদেশের তুলনায় জিডিপির অনুপাতে অনেক বেশি বরাদ্দ দিয়ে থাকে। স্পষ্টতই, বাংলাদেশে শিক্ষা খাত বরাবরই অবহেলিত ও উপেক্ষিত থেকেছে। গবেষণায় নগণ্য বরাদ্দের কারণে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিং আজ তলানিতে। লাইব্রেরিতে নেই আধুনিক রেফারেন্স বই, ল্যাবরেটরিতে নেই প্রয়োজনীয় রাসায়নিক ও যন্ত্রপাতি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত আবাসন ও পুষ্টিকর খাবারের নিশ্চয়তা রাষ্ট্র যথাযথভাবে দিতে পারছে না। এ জরাজীর্ণ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমান জনগণকে মোট চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে ঋণ ও দারিদ্র্যের চক্রে ঠেলে দিচ্ছে। বাস্তবতা হলো—সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, শয্যা ও ওষুধের চরম সংকট বিরাজ করছে। প্রতি ১০,০০০ জনে মাত্র ৬–৭ জন ডাক্তার থাকায় সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল ও অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে। অন্যদিকে, বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত বাণিজ্যিক রূপ নিয়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ফলে চিকিৎসা এখন আর মৌলিক অধিকার হিসেবে নিশ্চিত হচ্ছে না; বরং তা ক্রয়ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সর্বোপরি স্বাস্থ্যসেবায় চরম বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।
সর্বোপরি, আসন্ন বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ এবং চিকিৎসা খাতে ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে এগিয়ে নেবেন–এই প্রত্যাশা রইলো।”