” শাসনের আড়ালে শৈশব নিগ্রহ: ক্ষুব্ধ সমাজ, নিশ্চুপ প্রশাসন!”
সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টার- জাহারুল ইসলাম জীবন এর বিশেষ অনুসন্ধানী নিউজ প্রতিবেদন।👁️🗨️➤পড়াশোনায় সামান্য ভুল বা নিয়ম ভাঙ্গার অজুহাত-কারণ এটুকুই। অথচ তার মাশুল দিতে হচ্ছে রক্তভেজা পিঠ, শরীরের দগদগে জখম আর অমানবিক মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখানে শিশুদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা, সেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের এক শ্রেণীর মাদ্রাসায় শাসনের নামে চলছে মধ্যযুগীয় বর্বরতা। চার দেয়ালের আড়ালে কোমলমতি শিশুদের ওপর প্রতিনিয়ত চলা এই শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নে থমকে গেছে তাদের স্বাভাবিক শৈশব ও মেধা বিকাশ। একের পর এক সামনে আসা নৃশংস নির্যাতনের চিত্র পুরো সমাজকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে, জন্ম দিয়েছে চরম ক্ষোভের।
**➤চার দেয়ালের ভেতরের কঠোর বাস্তবতা:- সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক লোমহর্ষক ভিডিও এবং স্থানীয় তথ্যে উদঘাটিত হয়েছে শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ সব চিত্র। তুচ্ছ অজুহাতে এতিম, দুস্থ ও দরিদ্র পরিবারের কোমলমতি শিশুদের লাঠি বা বেত দিয়ে বেধড়ক পেটানো হচ্ছে। শুধু শারীরিক নির্যাতনই নয়, আবাসিক হলে খাবারের নামে চরম প্রহসন ও হরিলুট চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠে এসেছে। পরিবার ছেড়ে দূরে থাকা এই অসহায় শিশুরা প্রতিবাদ তো দূরের কথা, মুখ খোলার সাহসও পাচ্ছে না।
শারীরিক জখমের চেয়েও শিশুদের মনে বাসা বাঁধা মানসিক ক্ষত আরও গভীর। অনবরত গালিগালাজ আর ভীতি প্রদর্শন তাদের ঠেলে দিচ্ছে তীব্র ট্রমার দিকে। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এক চরম নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ভয়ে মাদ্রাসায় যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে সমাজ থেকে।
এক ভুক্তভোগী শিশুর ক্ষুব্ধ অভিভাবক আকুতি জানিয়ে বলেন,”সন্তানকে ভালো মানুষ বানাতে ও দ্বীনি শিক্ষায় বড় করতে মাদ্রাসায় পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু যেভাবে লাঠি দিয়ে পেটানো হয়েছে, তাতে ছেলেটা এখন আতঙ্কে কাপছে। সে আর কোনোভাবেই মাদ্রাসায় ফিরতে চাইছে না।”
**➤আইনের তোয়াক্কা ও প্রয়োগে শিথিলতা:- আইন অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।
**➤হাইকোর্ট ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা (২০১১):- স্কুল, মাদ্রাসা বা যেকোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেকোনো ধরনের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেয়া আইনত দণ্ডনীয়।
**➤আন্তর্জাতিক সনদ:- শিশু নির্যাতন জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের সরাসরি পরিপন্থী।
আইনের স্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নগণ্য। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরীণ ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতা এবং প্রশাসনিক মনিটরিংয়ের অভাবেই বারবার ঘটে চলেছে এমন পাশবিকতা। লোক দেখানো ক্ষমা প্রার্থনা বা লোকচক্ষুর অন্তরালে অনৈতিক আপসের মাধ্যমে অপরাধীদের পার পাওয়ার পথ সুগম হচ্ছে, যা এই ব্যাধিকে আরও উসকে দিচ্ছে।
**➤বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের তীব্র ক্ষোভ:- শিশু বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের মতে, ভীতি প্রদর্শন বা হিংস্রতার মাধ্যমে কখনোই নৈতিক শিক্ষা কিংবা মেধার বিকাশ সম্ভব নয়। এই সহিংসতা শিশুদের মনে অপরাধবোধ ও বিষণ্নতার জন্ম দেয়।
মানবাধিকার কর্মীদের স্পষ্ট বক্তব্য-লঘুদণ্ড বা আপস নয়, দণ্ডবিধি ও শিশু আইন অনুযায়ী দোষী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে।
**➤স্থায়ী সমাধান ও শূন্য সহনশীলতার দাবি:- অভিযোগ পেলে সাময়িকভাবে পুলিশ বা উপজেলা প্রশাসন গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার বা সাময়িক বহিষ্কার করলেও তা স্থায়ী সমাধান আনছে না। ভুক্তভোগী পরিবার ও সচেতন সুশীল সমাজ এখন কঠোর আইনি পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন।
➤১. জিরো টলারেন্স নীতি:- শিশুদের ওপর যেকোনো নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করতে হবে।
➤২. শিক্ষক নিয়োগে যাচাই:- মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সঠিক মানদণ্ড এবং মানসিক সুস্থতার পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
➤৩. নিয়মিত মনিটরিং:- প্রতিটি মাদ্রাসায় নিয়মিত প্রশাসনিক নজরদারি ও একটি নিরপেক্ষ ‘চাইল্ড প্রটেকশন’ বা শিশু সুরক্ষা সেল গঠন করতে হবে।
শিশুদের জন্য ভীতিমুক্ত, নিরাপদ ও স্নেহপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলা এখন আর কেবল একটি দাবি নয়-এটি রাষ্ট্রের আইনি বাধ্যবাধকতা এবং সমাজের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ। অবর্ণনীয় এই নির্যাতনের অবসান ঘটিয়ে ভয়ার্ত শৈশবকে রক্ষা করতে কঠোর আইন প্রয়োগ ও সার্বিক সচেতনতা-ই হতে পারে একমাত্র পথ।